অযৌক্তিক মুনাফা পাঁচ পণ্যে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৯ মে: রমজানে সর্বোচ্চ চাহিদার আমদানিকৃত ছোলা খুচরো বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ টাকায়। অথচ পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ের সব খরচ মিলিয়ে এ পণ্যটির সর্বোচ্চ বিক্রিমূল্য হওয়ার কথা প্রায় ৫৪ টাকা। অর্থাৎ এই এক পণ্যেই প্রতি কেজিতে প্রায় ৩৫ টাকা অতিরিক্ত হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ী চক্র। যদিও রমজান আসা পর্যন্ত এ পণ্যটির মূল্য আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একইভাবে রমজাননির্ভর ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি মূল্যে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা এবং তদারকি না থাকার সুযোগ নিয়ে এভাবেই ভোক্তাদের পকেট হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। শুধু এই ৫ পণ্য নয়, রমজানে সর্বোচ্চ চাহিদার প্রতিটি পণ্য নিয়েই কারসাজি চলছে।Onion
জানা গেছে, রমজানের আগেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পাঁচ পণ্য থেকে অযৌক্তিক মুনাফা হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। এর মধ্যে প্রতি লিটার ভোজ্যতেলে ১৫ টাকা, মসুর ডালে ২৬ টাকা ও মটর ডালে ১৪ টাকা, চিনিতে ৬ টাকা এবং পেঁয়াজে ১২ টাকা করে অতিরিক্ত লাভ আদায় করা হচ্ছে। আর এ মুনাফার ভাগ যাচ্ছে আমদানিকারক, পাইকার ও খুচরা পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের পকেটে। তবে এটি সম্ভব হচ্ছে দুর্বল বাজার তদারকি এবং যথাযথ আইন প্রয়োগের অভাবের কারণে। অসাধু চক্র এ অধিক মূল্য হাতিয়ে নিলেও এর খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ ভোক্তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্রের কৌশল। আগে রমজানের শুরুতে পণ্যের দাম অহেতুক বাড়ানো হতো। এখন করা হচ্ছে রমজানের অনেক আগে থেকেই। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির কারণেই বাড়ছে পণ্যের দাম। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, রমজাননির্ভর প্রতিটি পণ্যেরই চাহিদার চেয়ে জোগান অনেক বেশি। এ অবস্থায় মূল্যবৃদ্ধির কোনো কারণ নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোজা শুরুর এক মাস আগেই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে রমজাননির্ভর পাঁচ পণ্য ছোলা, চিনি, ডাল, সয়াবিন ও পেঁয়াজের দাম বাড়ছে বেশি। এসব পণ্যের আমদানি মূল্য, আড়তদার, পাইকারি এবং খুচরা মূল্যের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। এ অজুহাতে সবচেয়ে বেশি মুনাফা করছে আমদানিকারক ও আড়তদাররা। যার সুযোগ নিয়েছে খুচরা ব্যবসায়ীরা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে পণ্যের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণের একটি সাধারণ সূত্র বের করা হয়েছে। এ সূত্র অনুযায়ী আমদানিকৃত পণ্যের শুল্কায়নের পর আমদানিকারকের ১৫ শতাংশ ব্যাংক ঋণ, ৩ শতাংশ মুনাফা ও বন্দর থেকে গুদাম পর্যন্ত আসতে পরিবহন ব্যয় টনপ্রতি ১৫শ’ টাকা যোগ করা হয়। তবে ব্যাংক ঋণে (সিসি) ৬ মাসের সুদ হিসাব বের করে এক মাসের সঙ্গে যোগ করতে হবে। এছাড়া পাইকারি পর্যায়ে পরিবহন ব্যয়সহ ৬ শতাংশ মুনাফা এবং খুচরা পর্যায়ে পরিবহন ব্যয়সহ মুনাফা ১৫ শতাংশ ধরে যোগ করে খুচরা মূল্য বের করা হয়। কিন্তু এ সূত্র ব্যবহার করে দেখা গেছে, পাঁচ পণ্যে যৌক্তিক মূল্য থেকে লাগামহীন অতিরিক্ত মূল্য আদায় করা হচ্ছে।
পেঁয়াজ : বেনাপোল বন্দর দিয়ে ভারত থেকে ১১ থেকে ১৮ মে পর্যন্ত ৮ দিনে ৪ হাজার ৮৩২ কেজি পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে। প্রতি টন পেঁয়াজের মূল্য হচ্ছে গড়ে ১৬ হাজার ৭০৫ টাকা। এর সঙ্গে শুল্কায়ন খরচ ২৮ টাকা, ঢাকা পর্যন্ত প্রতি টনের পরিবহন খরচ ১২শ’ টাকা, ১৫ শতাংশ ব্যাংক ঋণের সুদ, ৩ শতাংশ মুনাফাসহ আমদানিকারকের মূল্য দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৯৩২ টাকা। পরবর্তী পর্যায়ে পাইকারদের পরিবহন ব্যয়সহ ৬ শতাংশ মুনাফা ধরে পেঁয়াজের পাইকারি মূল্য ২০ হাজার ৬৮ টাকার বেশি হবে না বলে আড়তদাররা স্বীকার করেন। শেষ ধাপ খুচরা পর্যায়ে পরিবহন ব্যয়সহ ১৫ শতাংশ মুনাফা ধরে বিক্রি করলে এক টন পেঁয়াজের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য হবে ২৩ হাজার ৯৮ টাকা। এ হিসেবে এক কেজি পেঁয়াজের মূল্য হবে ২২ টাকা ৫০ পয়সা বা ২৩ টাকা। কিন্তু বাজারে আমদানিকৃত পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৩৫ টাকায়। এভাবে কেজিতে বেশি দাম আদায় করা হচ্ছে ১২ টাকা।
ছোলা : খাতুনগঞ্জ ব্যবসায়ীদের তথ্য মতে, এখন যে ছোলা বাজারে আসছে তা আমদানি হয়েছে প্রায় দুই মাস আগে। এই ছোলা শুল্কায়ন শেষে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছানোসহ মূল্য হচ্ছে মণপ্রতি ১৫৩০ টাকা বা প্রতি কেজি ৪১ টাকা। এর সঙ্গে যোগ হবে আমদানিকারকের প্রায় ১৫ শতাংশ ব্যাংক ঋণ, ৩ শতাংশ মুনাফা, পাইকারি পর্যায়ে পরিবহন ও মুনাফাসহ ৬ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে আরও ১৫ শতাংশ মুনাফা। এই হিসেবে এক কেজি ছোলার সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য হওয়ার কথা ৫২.৭৫ টাকা। খুচরা বাজারে কেন ৮৫ থেকে ৯০ টাকায় ছোলা বিক্রি হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা উচিত বলে মনে করেন খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। এই হিসেবে যৌক্তিক মূল্যের চেয়ে শুধু ছোলায় অতিরিক্ত মুনাফা নেয়া হচ্ছে কেজিতে ৩২ থেকে ৩৫ টাকা।
ভোজ্যতেল : সব ধরনের খরচসহ পরিশোধিত সয়াবিন তেলের আমদানি মূল্য হচ্ছে মণপ্রতি ২৪শ’ টাকা, যা কেজিতে পড়েছে ৬৪ টাকা ৩০ পয়সা। এর সঙ্গে আমদানিকারকের ১৫ শতাংশ ব্যাংক ঋণ, ৩ শতাংশ মুনাফা, পাইকারি পর্যায়ে পরিবহন ও মুনাফাসহ ৬ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে একইভাবে ১৫ শতাংশ যোগ হবে। ওই হিসাবে এক কেজি সয়াবিনের খুচরা মূল্য দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৮৩ টাকা। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা তেলের মূল্য নির্ধারণ করেন মণ ও কেজিতে। তবে লিটারে এই মূল্য দাঁড়ায় ৭৫ টাকা। কিন্তু খুচরা বাজারে সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ৯৫ টাকায়। এ হিসেবে বেশি নেয়া হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা।
ডাল : আমদানি করা মটর ডাল খাতুনগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছানোর খরচসহ দাম পড়েছে প্রতি কেজি প্রায় ২৮ টাকা। অথচ এ পণ্যটি খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়। আমদানি, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের সব খরচ ধরার পর এই ডাল বিক্রি হওয়ার কথা ৩৬ টাকায়। এভাবে প্রকৃত মূল্য থেকে অতিরিক্ত ১৪ টাকা বেশি আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া একইভাবে মসুর ডালের খুচরা মূল্য হওয়ার কথা ১২৪ টাকা। কিন্তু বাজারে এখনই এই ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৫০ টাকায়। এ হিসেবে বাড়তি মূল্য নেয়া হচ্ছে কেজিতে ২৬ টাকা।
চিনি : আমদানিকৃত চিনির সব ধরনের খরচসহ মূল্য হচ্ছে কেজিপ্রতি ৪২ টাকা। কিন্তু এ পণ্যটির পাইকারি মূল্য ৪৫ টাকা ও খুচরা পর্যায়ে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সব ধরনের মুনাফা ও পরিবহন ব্যয় যোগ করার পর পণ্যটি খুচরা বাজারে সর্বোচ্চ ৫৪ টাকায় বিক্রি হওয়ার কথা। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়, যা প্রকৃত মূল্য থেকে কেজিতে ৬ টাকা বেশি। তবে দেশীয় চিনির মজুদ বেশি থাকায় আসন্ন রমজানের চিনির দাম খুব একটা বাড়বে না বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে ছোলার চাহিদা আছে ৬০ হাজার টনের। এর মধ্যে ৫০ হাজার টন প্রয়োজন হয় শুধু রমজানে। গত ৯ মাসে ছোলাসহ ডাল আমদানি হয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার টন। ৬০ হাজার টনের স্থলে আড়াই লাখ টন ছোলা আমদানির পর পানির দরেই পণ্যটি বিক্রি করার কথা। অথচ বিক্রি হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ দামে। এর কোনো কারণই খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়া চিনির অভ্যন্তরীণ চাহিদা ১২ থেকে ১৪ লাখ টন। গত ৯ মাসে আমদানি হয়েছে ১২ লাখ ২১ হাজার টন। যদিও রমজান মাসেই প্রায় দেড় লাখ টন চিনির চাহিদা রয়েছে। এছাড়া দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা ১৫ লাখ মেট্রিক টন। গত ৯ মাসে আমদানি হয়েছে ১৭ লাখ টন। এভাবে চাহিদার চেয়ে আমদানি বেশি হলেও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মূল্য বাড়ানোর প্রতিযোগিতা চলছে। বিষয়টি দেখার কথা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করা ছাড়া এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কোনো উদ্যোগই লক্ষ্য করা যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*