অনেক দেশই নির্বাচনকে ভালো ভাবে গ্রহণ করেননি

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৭ জুলাই: ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের পর বিএনপি জোট আবার জাতীয় নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অনেক দেশই এ নির্বাচনকে ভালো ভাবে গ্রহণ করেননি। আওয়ামী লীগের তরফ থেকে বলা হচ্ছে জামায়াত ছাড়লে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হতে পারে।k বিএনপি আগামী নির্বাচনের স্বার্থেই হয়তো জামায়াত ছাড়তে পারে। বিএনপি জামায়াত ছাড়লেও মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০১৯ সালের আগে হচ্ছে না এমনই আভাস দিচ্ছে আ.লীগ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন দেশে শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকার জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশে জঙ্গিবাদ সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন অনেকটাই তারা প্রভাব বিস্তার করছে। যার ফলশ্রুতিতে পর পর দুটি বড় হামলা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডসে বাংলাদেশ নিয়ে এক সেমিনারে অংশ নিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুটি পৃথক প্রতিনিধিদল এখন লন্ডনে অবস্থান করছে। আওয়ামী লীগের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ও বিএনপির পক্ষে নেতৃত্বে আছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
১৯ জুলাই সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। এতে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হবে। সেমিনারে অংশগ্রহণকারীরা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জঙ্গি ও সন্ত্রাসী হামলাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন।
বিএনপি মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা বললেও আওয়ামী লীগ বার বার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোন সম্ভাবনা নেই। ২০১৯ সালে অনুষ্ঠেয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী শেখ হাসিনা সরকারের অধীনেই হবে। বর্তমানে জঙ্গিবাদ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগ।
বিদেশিদেরকেও আওয়ামী লীগ সাফ জানিয়ে দিয়েছে ২০১৯ সালের আগে দেশে কোন মধ্যবর্তী নির্বাচন হবে না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাইকে কূটনৈতিক ভাষায় জানিয়ে দেয়া হয়েছে। এমনকি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের প্রস্তাবে সম্মত নয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এমন আভাস পাওয়া গেছে। কূটনীতিকসহ একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই জঙ্গি হামলা প্রতিরোধে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব দেন। সরকারের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হয়, বাংলাদেশ এই মুহূর্তে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা ভাবছে না। জঙ্গি দমন করে উন্নয়নমূলক কর্মকা- অব্যাহত রাখতে চান বাংলাদেশের মানুষ। জঙ্গি হামলা বন্ধে বাংলাদেশের কার্যক্রমে মার্কিন মেরিন সেনাদের সম্পৃক্ততার প্রস্তাবও দেন নিশা। আইএসের অস্তিত্ব বাংলাদেশে থাকার কথাও বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর দুই উপদেষ্টা, এমনকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল স্পষ্টভাবে নিশা দেশাইকে জানান, বাংলাদেশের জঙ্গিরা আইএস নয়। তারা জামায়াতের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রশিবিরের দুর্র্ধর্ষ সন্ত্রাস। হামলায় স্পটে যারা আটক হয়েছেন, তাদের জিজ্ঞাসাবাদে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
এর জবাবে নিশা দেশাই বলেন, দেশি জঙ্গিদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের যোগাযোগ রয়েছে। তাদের সঙ্গে আইএসের যোগাযোগ থাকায় ভিডিও বার্তায় দায় স্বীকার ও গুলশানে হত্যার তথ্য প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে জঙ্গিদের দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণসহ লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে চায়। এ জন্য জঙ্গি ধ্বংসে দক্ষ মার্কিন বাহিনী সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
এতে সরকারের সবুজ সংকেত না পাওয়ায় নিশা দেশাই বলেন, আমাদের কাছে তথ্য আছে, জঙ্গি হামলা আরো হবে। ঢাকার মার্কিন দূতাবাস ও কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দূতাবাসের ভেতরে ও বাইরে সশস্ত্র মার্কিন মেরিন সেনা নিয়োজিত করার প্রস্তাব দেন। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, লিখিত প্রস্তাব হলে সাংবিধানিক ও আইনগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরে জানানো হবে।
পরে নিশা দেশাই ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে সমন্বিত ও পৃথক বৈঠক করেন। বৈঠকে ভারত, রাশিয়া, চীনসহ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার বাংলাদেশে মধ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। এমনকি বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরাও মধ্যবর্তী নির্বাচনের বিপক্ষে মত দিয়েছেন নিশা দেশাইকে বলে জানা গেছে।
সূত্র জানায়, পৃথক বৈঠকে মার্কিন প্রস্তাবের সঙ্গে ভারতীয় কূটনীতিকরা তাদের হাইকমিশন অফিস ও ভারতের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় তাদের নিজস্ব বাহিনী রাখার প্রস্তাবে একমত পোষণ করেন। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর এক উপদেষ্টা বলেছেন, জঙ্গি দমনে মার্কিন বাহিনী প্রেরণের প্রস্তাবে সরকার রাজি হয়নি। জঙ্গি দমনে বাংলাদেশের বাহিনী পুরোপুরি সক্ষম। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বুধবার কুষ্টিয়ায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, বিদেশি একটি বাহিনী পাঠানোর প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে সরকার।
এদিকে নিশা দেশাইয়ের ঢাকা সফরে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের নির্ধারিত কর্মসূচি না থাকলেও তার সঙ্গে ফোনে আলাপ করেন বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করার আগে ফোনে আলাপকালে খালেদা জিয়াকে নিশা দেশাই বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের টেকসইয়ে সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের অবস্থান বদলায়নি।
এ সময় খালেদা জিয়া তাকে জানান, বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা না থাকায় এবং জঙ্গি দমনের নামে বিরোধী অসংখ্য নেতা-কর্মীকে দমন-পীড়ন ও গুম করা হচ্ছে। এমনকি গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে সম্পাদক, সাংবাদিক নেতা ও সাংবাদিকদের মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে জেলে পুরছে। সব সমস্যা নিরসনের উপায় এখনই গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা নেয়া। পরে নিশা দেশাই বলেন, আপনার সঙ্গে আমি সাক্ষাৎ করব না। বার্নিকাট দেখা করে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব জানাবেন। ফোনে এ আলোচনা হয়েছে বলে একটি সূত্র দাবি করে।
সূত্র মতে, বাংলাদেশে জঙ্গি দমনে সর্বদলীয় সংলাপে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীসহ সব দলের অংশগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। কিন্তু ভারত, রাশিয়াসহ অধিকাংশ দেশ এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে। বাংলাদেশ সরকারও জামায়াতকে সঙ্গে রাখায় সংলাপে বসতে আপত্তি জানায়।
অন্যদিকে গুলশানে জঙ্গি হামলার পর ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। দূতাবাসের অভ্যন্তরে এফবি আই সদস্য সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বাড়ানো হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, দূতাবাসে নিজস্ব নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে ব্রিটেন, জার্মানি, জাপান প্রস্তাব দেয়ার কথা ভাবছে। তারাও সরকারকে লিখিত প্রস্তাব দিতে পারে।
আইএস প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বাংলাদেশে কোন আইএস নেই। এরা দেশীয় জঙ্গি। নিশা দেশাইকে আমরা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বোঝাতে সক্ষম হয়েছি, এদেশে কোন আইএসের অস্তিত্ব নেই। গুলশানের আগে পরিকল্পিতভাবে যেসব হত্যা করা হয়েছে, সবগুলো একসূত্রে গাঁথা। সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ও উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করতে এসব হামলা করা হচ্ছে।
মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তায় তাদের নিরাপত্তা বাহিনী প্রস্তাব করলে আমরা বলেছি, জঙ্গি দমনে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী সক্ষম। দূতাবাসগুলোতে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। গুলশানে জঙ্গি হামলায় আমাদের সশস্ত্র বাহিনী মাত্র কয়েক মিনিটের অভিযানে সফল হয়েছে, যা বিশ্বে নজিরবিহীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*