অধিকারের সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খানের সংবাদ সম্মেলন

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২২ জুলাই ২০১৭, শনিবার: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা অধিকারের সেক্রেটারি আদিলুর রহমান খান আজ শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে তাকে আটক রাখা এবং সেখান থেকে তাকে ঢাকায় ফেরত পাঠানো ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। আদিলুর রহমান জানান, কেন তাকে মালয়েশিয়ায় ঢুকতে না দিয়ে সেখানে আটক রাখা হয় এবং দেশে পাঠানো হলো সে বিষয়ে এখনো তিনি কিছু জানতে পারেননি। তবে আটকের সময় এক কর্মকর্তা তাকে শুধু বলেছেন খুবই উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে তাকে আটক রাখা হয়েছে এয়ারপোর্টে।
গুলশান অধিকার কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আদিলুর রহমান খান বলেন, এয়ারপোর্টের পাশে যে কক্ষে তাকে আটক রাখা হয় সেটি আসলে একটি ডিটেনশন সেন্টার বা বন্দীশালা। এটি সরকারি নয়, বেসরকারিভাবে পরিচালিত। তিনি বলেন তার মতো অনেক বাংলাদেশিকে সেখানে আটক রাখা হয়েছে। তারা সবাই বৈধ ভিসা নিয়ে মালয়েশিয়া গেছেন।
কেউ কেউ চার-পাঁচ বছর ধরে সেখানে রয়েছেন। টাকা না দিলে তাদের কোনো খাবার দেয়া হচ্ছে না। কেউ কেউ শুধু কলের পানি খেয়ে রয়েছেন। যাদের কাছে বাংলাদেশে আসার ফিরতি টিকিট আছে শুধু তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু যাদের ফিরতি টিকিট নেই তাদের সেখানে আটক রাখা হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আদিলুর রহমান খান বলেন, গত ১৯ জুলাই রাত ১১টায় মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে আমি যাত্রা করি। ২০ জুলাই মালয়েশিয়ান সময় ভোর ৪টা ৫০ মিনিটে কুয়ালালামপুর ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দরে পৌঁছাই। কুয়ালালামপুরে আয়োজিত এন্টি-ডেথ পেনাল্টি এশিয়া নেটওয়ার্ক (এডিপিএএন)-এর দ্বিতীয় সাধারণ অধিবেশনে যোগ দেয়ার কথা ছিল ওইদিন সকালে।
আমি অধিকারের একজন প্রতিনিধি হিসেবে সেখানে যাবার অনুমতি পাই। আমাকে সেখানে যাবার জন্য ঢাকাস্থ মালায়েশিয়া দূতাবাস থেকে ভিসা দেয়া হয়েছে, মালয়েশিায়ান এয়ালাইন্সের টিকিটও পাই আমি। সেখানে যাওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকে কোনো সমস্যা হলো না। কিন্তু এয়ারপোর্টে নামার পর সেখানে আমাকে আটকে রেখে দেশে ফেরত পাঠানো হলো।
এয়ারপোর্টে আটক রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, ইমিগ্রেশন ডেস্কে আমার পাসপোর্ট জমা দেয়ার পর ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা আমার নাম ডাটাবেজে প্রবেশ করানোর পর আমাকে এক টুকরো কাগজ দেন যেখানে মালয়া ভাষায় দুটো শব্দ লেখা ছিল। যার অর্থ ‘সন্দেহভাজন’ (সাসপেক্ট)। এরপর আমাকে আরেক কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয় পাসপোর্ট যাচাইয়ের জন্য।
এ সময় পুলিশ একটি ফোন করে এবং নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। পুলিশ আমার কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানায়। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে আমাকে অপর একজন ইমিগ্রেশন পুলিশ কর্মকর্তাকে অনুসরণ করতে বলা হয়। আমাকে যখন বিমানবন্দরের অপর প্রান্তে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন এডিপিএএন-এর একজন সমন্বয়ককে আমার ফোন থেকে ইমেইল করতে সক্ষম হই। এক বাক্যে আমি তাকে জানাই যে আমাকে বিমানবন্দরের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হচ্ছে না এবং সম্ভবত আমাকে আটক করা হবে।
এরপর তারা ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশন, স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা সুয়ারামসহ মানবাধিকার ও আইনজীবী সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থাকে আমার বিষয়ে অবহিত করে।
বিমানবন্দরের পাশে নিয়ে যাওয়ার পর লক-আপে আমাকে জুতা খুলতে বলা হয় এবং সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র আলাদা করে রাখতে বলা হয়। আমার সেলফোন ও ল্যাপটপ সরিয়ে নেয়া হয়। এরপর আমাকে বড় একটি কক্ষে আটক রাখা হয়। এ কক্ষটি শুধু ইলেক্ট্রনিক পাসওয়ার্ড দিয়ে খোলা যায়। ওই কক্ষে আনুমানিক ৬০ জন ব্যক্তি ছিল যাঁদের বেশিরভাগই ছিলেন বাংলাদেশী।
আদিলুর রহমান বলেন, এক ঘণ্টা পর আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে পানি বিস্কুটসহ আরো কিছু জিনিস দেয়। দুপুরের দিকে, এক পুলিশ কর্মকর্তা এসে আমাকে জোরে জোরে বলেন, কেন আমি আমার অবস্থা অন্যদের জানিয়েছি। এরপর আমাকে বড় রুম থেকে বের করে ছোট একটি রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমার টাকায় আমাকে দুপুরের খাবার দেয়া হয়।
সন্ধ্যার দিকে আমাকে আবার নেয়া হয় প্রথম যে রুমে রাখা হয়েছিল সেখানে। সেখানে হিউম্যান রাইটস কমিশনের দু’জন প্রতিনিধিকে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার অনুমতি দেয়া হয়। তারা জানান, আমার সাথে সাক্ষাতের জন্য একজন আইনজীবী, মালয়েশিয়ান ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশনের একটি দল এসেছিল। কিন্তু তাদের আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার অনুমতি দেয়া হয়নি।
সাক্ষাতের পর সন্ধ্যা ৭টায় আমাকে বোর্ডিং গেটে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ঢাকাগামী মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট এমএইচ ১১২-তে উঠিয়ে দেয়া হয়।
এয়ারপোর্টের পাশে বড় যে রুমে আটক ছিলেন আদিলুর রহমান সেখানে আটক থাকা অনেক বাংলাদেশীদের বিষয়ে বলেন, সেখানে ৬০ জনের মতো আটক দেখেছেন তিনি যাদের বেশিরভাগ বাংলাদেশী। তারা সবাই বৈধ ভিসা নিয়ে বৈধভাবে মালয়েশিয়া গেছেন। মালয়েশিয়ান দূতাবাস তাদের ভিসা দিয়েছে। তাদের একজন হলেন মো : ইমরান হোসেন।
তিনি প্রফেশনাল ভিসা নিয়ে গেছেন। চারদিন ধরে তিনি সেখানে আটক আছেন। আরেক নারী তিন মাসের ভিসা নিয়ে মালয়েশিয়া গেছেন। তার স্বামী ১১ বছর ধরে সেখানে কাজ করছে। স্বামীর সাথে দেখা করার জন্য তিনি সেখানে যান। ঢাকাস্থ মালয়েশিয়ান দূতাবাস তাকে ভিসা দিয়েছে। কিন্তু তাকেও আটকে দেয়া হয়েছে। ওই নারীকে আমার সাথে একই ফ্লাইটে ঢাকায় ফেরত পাঠানো হয়।
আদিলুর রহমান বলেন, ইমরান হোসেনসহ অনেকে আমার কাছে কান্নাকাটি করে তাদের দুরাবস্থার কথা জানিয়েছেন। বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় গিয়েও কেন তাদের এয়ারপোর্টে আটক রাখা হলো তা তারা জানতে চান। তারা সরকারের সহায়তা চান। তাদের কেউ কেউ শুধু পানি খেয়ে আছেন।
সেখানকার কর্মকর্তারা আটক ব্যক্তিদের সাথে রূঢ় আচরণ করছে। ‘নো মানি-নো ফুড’ মন্তব্যও করেছে তারা। সেখানে থাকা কোনো কোনো বাংলাদেশিরা আমাকে বলেন যে, তাদের পরিবার জানে না যে তারা কোথায় আছেন? কেউ কেউ অর্থের বিনিময়ে ফোন করতে পারছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*