অদৃশ্য ঘাতক বায়ু দূষণ

বিজয় চক্রবর্তী, সোমবার, ৫ ডিসেম্বর: পৃথিবীর প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ শহরে বাস করে এবং উন্নত দেশের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের অর্থনৈতিক কার্যকলাপের সবচেয়ে বেশি প্রভাব দেখা যায় শহরের জলবায়ুতে। উন্মুক্ত স্থান বা কৃষিভূমিতে পরিবর্তন 1এনে দালান-কোঠা, পাকা রাস্তাঘাট, ভূপৃষ্ঠ ও ভূগর্ভস্থ নর্দমা ও শিল্পকারখানা তৈরির ফলে শহরগুলোতে নিজস্ব ক্ষুদ্রায়ত জলবায়ুর সৃষ্টি হয়। যেমনটি হয়েছে ঢাকা ও চট্রগ্রামে। বিভিন্ন শহরের ক্ষুদ্রায়ত জলবায়ুর প্রকৃতি আলাদা হলেও নগরায়নের ফলে আগের ক্ষুদ্রায়ত জলবায়ুর পরিবর্তন হয়।
বায়ুতে নানা প্রকারের ভাসমান দূষিত পদার্থের মধ্যে কার্বন, সিসা ও অ্যালুমনিয়াম প্রধান। তাছাড়া শহরের বায়ুতে প্রচুর পরিমাণ ধূলিকণাও থাকে। বাতাসে ভাসমান বস্তুকণার মধ্যে যেগুলোর ব্যাস ১০ মাইক্রোমিটার সেসব বস্তুকণাকে পার্টিকুলার ম্যাটার (পিএম)-১০ এবং যেসেব বস্তুকণার ব্যাস দুই দশমিক পাঁচ মাইক্রোমিটার সেগুলোকে পার্টিকুলার ম্যাটার (পিএম)-২.৫ এই দুই ভাগে ভাগ করে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপন করা হয়। আর এই দু শ্রেণীর বস্তুকণার বাতাসের প্রতি ঘনমিটারে কত মাইক্রোগ্রাম আছে তা পরিমাপ করা হয় পার্টস পার মিলিয়ন বা পিপিএম এককে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, বাতাসের একিউআই মাত্রা শুন্য থেকে ৫০ পিপিএম হলে তাকে সবুজ বা স্বাস্থ্যকর বায়ু বলা হয়। একিউআই মাত্রা ৫১ থেকে ১০০ পিপিএম হলে তাকে মধ্যম বায়ু বলা হয়। যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। মাত্রা ১০১ থেকে ১৫০ পিপিএম হলে সে বায়ুকে সতর্ককতামূলক বায়ু বলা হয়। যেটা মানুষের জন্য মৃদু ক্ষতিকর। একিউআই মাত্রা ১৫১ থেকে ২০০ পিপিএম হলে সে বায়ুকে অস্বাস্থ্যকর শ্রেণীতে ফেলা হয়। ২০১ থেকে ৩০০ পিপিএম একউিআই মাত্রার বাতাসকে খুবই অস্বাস্থ্যকর শ্রেণীতে এবং ৩০১ থেকে ৫০০ পিপিএম মাত্রার বাতাসকে চরম পর্যায়ের অস্বাস্থ্যকর বায়ু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের আওতাধীন ‘টেকসই বায়ু ও নির্মল পরিবেশ’ প্রকল্পের একিউআই প্রতিবেদন থেকে দেখা যায় গত বছরের শেষ দিন অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর ঢাকার একিউআই মাত্রা ৩৩৯ পিপিএম, চট্টগ্রামের মাত্রা ২৫৪ পিপিএম, গাজীপুরের মাত্রা ৩৭২ পিপিএম, সিলেটের মাত্রা ১৯৪ পিপিএম, রাজশাহীর মাত্রা ৩৩৫ এবং বরিশালের মাত্রা ৪০২ পিপিএম। বায়ু দূষণকে অদৃশ্য ঘাতক আখ্যা দিয়েছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। সম্প্রতি প্রকাশিত সংস্থাটির এক প্রতিবেদেনে বলা হয়েছে ‘বায়ু দূষণ সবসময় খোলা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এটা অন্যতম মৃত্যুর কারণ। বিশ্বের ৩৬ ভাগ ফুসফুসে ক্যান্সার, ৩৪ ভাগ স্ট্রোক এবং ২৭ ভাগ হৃদরোগের জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী বায়ু দূষণ। পৃথিবীর ৮০ ভাগের বেশি শহরের বায়ু অনিরাপদ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
ভয়াবহ এই অবস্থা রোধে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা এবং ক্লিন এয়ার কোয়ালিশন (সিসিএসি) বিশ্বব্যাপী সচেতনতা গড়ে তুলতে কাজ শুরু করেছে। বায়ু দূষণের ভয়াবহতা থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করতে ‘ব্রিদ লাইফ’ নামে বিশ্বব্যাপী একটি প্রচারণাও শুরু করেছে। দূষিত বায়ু রক্তে অক্সিজেন চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। ফলে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়- যা স্ট্রোকের অন্যতম কারণ। দুই হাজার শহরের ওপর গবেষণা করে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এমন অনেক শহরে মানুষজন বসবাস করছে, যেখানে বায়ু দূষণ স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত মাত্রার ওপরে চলে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক তাদের এক গবেষণায় দেখিয়েছে, বায়ু দূষণ বৃদ্ধির কারণে মস্তিষ্কের আকৃতি হ্রাস পায়। আর এর ফলে হৃদরোগসহ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের হাভার্ডের টিএইচ চ্যান পাবলিক স্কুল অব পাবলিক হেলথ ও বোস্টনের বেথ ইসরায়েল ডিয়াকোনেস মেডিকেল সেন্টারের গবেষকরা বায়ু দূষণের সঙ্গে মস্তিষ্কের আকৃতি হ্রাসের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেন। গবেষকরা এক হাজার রোগাক্রান্ত মানুষের ওপর গবেষণা করেন। এসব রোগীর মস্তিষ্ক স্ক্যান করে ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখা হয়। এতে দেখা যায় কম বায়ু দূষণ বা দূষণহীন আবহাওয়ায় থাকাদের চেয়ে দূষণের মধ্যে থাকা রোগাক্রান্তদের মস্তিষ্কের আকৃতি বেশি হ্রাস পেয়েছে। কম বায়ু দূষণে দীর্ঘ সময় উপস্থিতির কারণেও মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়। পরীক্ষায় অংশ নেয়া রোগীদের সবার বয়স ছিল ৬০ বা তদূর্ধ্ব। আর স্ট্রোক ও স্মৃতিহারোনো রোগীদের এই পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। গবেষণায় দেখা গেছে, বাতাসে দুই মাইক্রোগ্রাম (এক গ্রাম = দশ লাখ মাইক্রোগ্রাম) ধাতব কণার উপস্থিতি বৃদ্ধির কারণে মানুষের মস্তিষ্কের ঘনত্ব কমে দশমিক ৩২ শতাংশ। গবেষকরা বলেন, দূষিত বায়ুর মধ্যে দীর্ঘ সময় কাটালে মস্তিষ্কে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। এমনকি অত্যন্ত কম দূষণেও দীর্ঘ সময় কাটালে মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়। অত্যন্ত দূষিত বায়ুতে দীর্ঘদিন বসবাসকারীদের মস্তিষ্কের মধ্যকার ঘনত্ব ও আকৃতি অন্যদের তুলনায় বেশ কম। আর মস্তিষ্কের আকৃতি ও ঘনত্ব হ্রাসের কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। ধূমপান যেভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতি করে, দূষিত বায়ু ঠিক একই ভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতি করে।
কিছুদিন আগে অপর এক প্রতিবেদনে বিশ্বের অনেক শহরে বায়ু দূষণের মাত্রা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে সতর্ক করে দেয় বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। বায়ু দূষণ বাড়িয়ে দিতে পারে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিও। এই উচ্চরক্তচাপ মানুষের অসুস্থতা ও অকাল মৃত্যুর এক অন্যতম কারণ।
ইউরোপের বিভিন্ন নগরীর ৪১ হাজারের বেশী বাসিন্দার ওপর গবেষণা চালিয়ে এ সংক্রান্ত তথ্য ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নালে প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে গবেষকরা জানান, ক্রমাগত শব্দ দূষণ বিশেষ করে যানবাহন সৃষ্ট শব্দদূষণ মানুষের হাইপারটেনশনও বাড়িয়ে দিতে পারে। জার্মানির ডুয়েসেলডরফের হেনরিখ-হাইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বারবারা হফম্যানের নেতৃত্বে ৩৩ জন বিশেষজ্ঞ এ গবেষণা পরিচালনা করেন। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, জার্মানি ও স্পেনের ৪১ হাজার ৭১ জন বাসিন্দার ওপর পাঁচ থেকে নয় বছরব্যাপি এ গবেষণা চালানো হয়।গবেষণায় দেখা যায় গেছে, একই বয়সের ব্যক্তি যিনি শহরের বায়ু ও শব্দ দূষণ এলাকায় বসবাস করছেন তার উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম দূষণ এলাকায় বসবাস করা ব্যক্তির তুলনায় অনেক বেশি। পাশের দেশ ভারতে সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারী রিপোর্ট অনুযায়ী গত ১০ বছরে বায়ু দূষণের ফলে শ্বাস নালিতে তীব্র সংক্রমণের ফলে প্রাণ হারিয়েছেন ৩৫ হাজারেরও বেশি । ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (হু) বছরের মাঝামাঝিতে একটি রিপোর্টে দেখিয়ে ছিল কিভাবে সারা বিশ্বেই বায়ু দূষণের কবলে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। এই তালিকায় সব থেকে উপরে ছিল ভারত ও চিনের নাম। এনভায়রেনমেবন্টাল সায়েন্স ও টেকনোলজি জার্নালে প্রকাশিত একটি স্টাডিতে দাবি করা হয়েছে শুধু মাত্র দিল্লিতেই দূষিত বায়ুর প্রকোপে প্রত্যেক দিন প্রাণ হারান প্রায় ৮০ জন। দিল্লির মত অবস্থানে যাওয়ার পূর্বেই আমাদের রুখে দিতে হবে বায়ু দূষন। প্রাকৃতিক দূষণ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত চাইলেই থামানো যায় না। অনেক দূষণই হয় মানুষের দোষে। কয়লা জ্বললে যে দূষণ হয়, গাড়ি চললে যে দূষণ হয়, এসব বন্ধ করা কঠিন নয়। ঢাকার রাস্তাই গাড়ি গিজগিজ করছে, রাস্তায় সাইকেল চালানোর পথ নেই। মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত লোকেরা ধরেই নিয়েছে যে পাবলিক বাসে চড়লে তাদের মানসম্মান যাবে। মানসম্মান বাড়ানোর জন্য অনেকের একাধিক গাড়ি। টাকার ঝনঝনানি শুনিয়ে মানসম্মান অর্জন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দূষিত করে তুলছি নিজেরাই। বায়ু দূষণ রোধের লক্ষ্যে নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোগ শুরু হয় ২০০৯ সালে। ৪৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনায়, রাজশাহী গাজীপুর, ও নারায়ণগঞ্জে বায়ু দূষণ রোধের কার্যক্রম শুরু হয়। বায়ুর মান উন্নয়ন ও ইটভাটা ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের মাধ্যমে যানজট নিরসন, বাসরুট নেটওয়ার্ক যুক্তিযুক্তকরণ, পরিবহন খাতের দক্ষতা উন্নয়ন করা ইত্যাদি নিয়ে কাজ করছে সরকার। কিন্তু বাড়তি জনসংখ্যা এক্ষেএে বাড়তি চাপ হয়ে দাড়িয়েছে। বায়ু দূষণের হার শতকরা ২০ থেকে ৮০ শতাংশ হ্রাস করে বছরে সাড়ে ৩ হাজার লোকের জীবন বাঁচানো সম্ভব। ৮০ থেকে ২৩০ মিলিয়ন জনগণের স্বাস্থ্য ঝুঁকি হ্রাস করা সম্ভব।
শুধুমাত্র সরকারের উপর দায় না চাপিয়ে আসুন দেশকে দূষণমুক্ত করতে নিজেদের আরাম-আয়াশে একটু ছাড় দেয়। আপনার আমার একটু একটু করে দেয়া ছাড়ে হয়ত পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বিশুদ্ধ বায়ুর শহর কিংবা দেশ রেখে যেতে পারব। রুখে দিতে পারবো অদৃশ্য ঘাতক বায়ু দূষণ।
লেখকঃ প্রকৌশলী, প্রাবন্ধিক।
Email: engrbijoychakraborty@gmail.com

Leave a Reply

%d bloggers like this: